Monday , October 14 2019
প্রচ্ছদ / রাজনীতি / বিএনপির ‘দুর্বার তৃণমূল’ মিশন

বিএনপির ‘দুর্বার তৃণমূল’ মিশন

আঞ্চলিক রাজনীতিতে শক্তির দ্বন্দ্ব আর বিভেদে ‘বিপর্যস্ত’ বিএনপির তৃণমূলকে নির্বাচনের আগেই ‘দুর্বার সাংগঠনিক ভিত’ দিতে কাজ শুরু করেছে দলটি।

এজন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ৭৫টি সাংগঠনিক জেলায় দলটির শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বে ৫১টি টিম করে দেওয়া হয়েছে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত এই শীর্ষ নেতারা তৃণমূলে গিয়ে সেখানকার স্থানীয় নেতাদের মতামত, পরামর্শ, অভিযোগ শুনবেন এবং সংকট সমাধানে পদক্ষেপ নেবেন। অর্থাৎ নির্বাচনের আগে মাঠপর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে ঐক্য গড়ে শক্তিশালী ভিত তৈরি করবেন নেতারা তাদের এই মিশনে।

জানতে চাইলে বিএনপির নীতি নির্ধারনী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সোমবার  বলেন, ‘সংগঠন গোছাতে এই সাংগঠনিক সফর দলকে শক্তিশালী করার ধারাবাহিক অংশ। এটি নির্দিষ্ট সময় পরপর হয়ে থাকে। বিশ্বাস করি, কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূলের কাছে গেলে সেখানকার নেতা-কর্মীরা আরো উজ্জীবিত হবেন। এর মাধ্যমে আগামী নির্বাচনের আগে মাঠপর্যায়ে বিএনপির শক্তিশালী হবে।’

সাংগঠনিক এসব সফরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের ভূমিকা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সফরে নেতারা তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ করবেন, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলবেন, তাদের মতামত, পরামর্শ, অভিযোগ শুনবেন। কোনো সংকট থাকলে তা সমাধানের গতিপথ ঠিক করে দেবেন।’

‘তৃণমূল বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ করার’ এই প্রক্রিয়া দলটির নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে চলমান আন্দোলনে নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করবে বলে মনে করেন নজরুল ইসলাম।

বিএনপির রাজনীতিতে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মনে করা হয় শক্তির উৎস। দলটির নেতারা মনে করেন, বিএনপির যা কিছু অর্জন তার শতভাগই ওই তৃণমূলের অবদান। কিন্তু প্রায় এক দশকের বেশি সময়ে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির তৃণমূলে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। একসময় মাঠপর্যায়ে দুর্বার পরিস্থিতি থাকলেও এখন অনেকটাই ছন্নছাড়া। যদিও দলটির নেতারা এজন্য সরকারের নির্যাতনকে দায়ী করেন। তবে তারা বলছেন, দেশে রাজনীতি না থাকলেও প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এখন পর্যন্ত তৃণমূল নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ এবং শক্তিশালী আছে।

যেমনটি বলছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান।  তিনি বলেন, ‘বিএনপির তৃণমূল এখনো আগের মতো শক্তিশালী আছে। বিএনপি নেতারা যে সাংগঠনিক সফরে বের হবেন তা কোনো বিশেষ উদ্দেশে নয়, এটি বছরের দুই-তিনবার হয়ে থাকে।’

মাঠপর্যায়ে নেতা-কর্মীদের উৎসাহিত করতে এসব সাংগঠনিক সফর হয়ে থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য হচ্ছে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের নার্সিং  করা। সংগঠনের কোনো সমস্যা, দুর্বলতা আছে কি না, থাকলে এগুলো কাটিয়ে উঠতে কি প্রয়োজন তা নিয়েই মূলত পর্যালোচনা, গাইডলাইন দেওয়া।’

দলীয় সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের মাঠপর্যায়ে বিএনপির শক্তিশালী অবস্থান আর আগের মতো নেই। কেন্দ্র থেকে কর্মসূচি দিলে সারাদেশে তা পালন হয় ঢিলেঢালাভাবেই। অনেক জেলায় নামেমাত্র পালন হয় কর্মসূচি। এজন্য সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করা হচ্ছে।

নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি তো বটেই তৃণমূলপর্যায়ে দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক ইউনিটে ১৫-১৬ বছর কমিটি হয় না। উপজেলা, ইউনিয়নপর্যায়ে তা আরো ভয়াবহ। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে যে তৃণমূলের দুর্দান্ত ভূমিকা ছিল, দীর্ঘদিন কমিটি না থাকা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তা লেজে-গোবরে অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৃণমূলকে উজ্জীবিত করতে না পারলে এর বড় মাশুল দিতে হতে পারে দলটিকে। এই ভাবনা থেকেই মূলত এবারের জেলার সাংগঠনিক সফরকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। এবারের সাংগঠনিক সফরের নজরদারি করছেন খোদ বিএনপি প্রধান নিজেই। সফর শেষে তার হাতে ভালো-মন্দ রিপোর্ট তুলে দিতে বলা হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে ঝিমিয়ে থাকা তৃণমূলকে জাগিয়ে তুলতে দলের ৫১ জন শীর্ষ নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ৬ জন স্থায়ী কমিটির সদস্য, ১৯ জন ভাইস চেয়ারম্যান, ১০ জন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, একজন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ৬ জন যুগ্ম মহাসচিব ও ৫জন সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ৫১ নেতাদের এই দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

৫১টি টিমের মধ্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ এবং মানিকগঞ্জ, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলা ও মহানগর, মির্জা আব্বাস বরিশাল উত্তর ও দক্ষিণ এবং মহানগর, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় রাজশাহী জেলা ও মহানগর, আবদুল মঈন খান নোয়াখালী ও লক্ষীপুর, নজরুল ইসলাম খান রংপুর জেলা ও মহানগর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সিলেট জেলা ও মহানগর, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ, অধ্যাপক এম এ মান্নান নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ নীলফামারী ও লালমনিরহাট চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী ঝালকাঠি, সেলিমা রহমান নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ, মোহাম্মদ শাহজাহান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ মীর মো. নাসিরউদ্দিন চাঁদপুর ও কক্সবাজার, খন্দকার মাহবুব হোসেন ঢাকা জেলা, রুহুল আলম চৌধুরী কুড়িগ্রাম, ইনাম আহমেদ চৌধুরী শেরপুর, আমিনুল হক চাঁপাইনবাবগঞ্জ, আবদুল আউয়াল মিন্টু কুমিল্লা উত্তর ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া, এজেডএম জাহিদ হোসেন সিরাজগঞ্জ ও পাবনা, শামসুজ্জামান দুদু কুমিল্লা দক্ষিণ ও বান্দরবান, আহমেদ আজম খান জামালপুর ও শরীয়তপুর, জয়নাল আবেদীন গাজীপুর, নিতাই রায় চৌধুরী বরগুনা, শওকত মাহমুদ রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান টাঙ্গাইল, মিজানুর রহমান মিনু পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও, আবুল খায়ের ভুঁইয়া মাগুরা, জয়নুল আবদিন ফারুক জয়পুরহাট, অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ঝিনাইদহ, মনিরুল হক চৌধুরী মেহেরপুর, ফজলুর রহমান নরসিংদী, হাবিবুর রহমান হাবিব পটুয়াখালী আতাউর রহমান ঢালী ফেনী, নাজমুল হক নান্নু ফরিদপুর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী খুলনা ও মহানগর, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন মাদারীপুর, মজিবুর রহমান সারোয়ার ভোলা, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যশোর, খায়রুল কবির খোকন নাটোর, হাবিব উন নবী খান সোহেল বগুড়া ও গাইবান্ধা, হারুন অর রশীদ নওগাঁ, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন মুন্সীগঞ্জ, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বাগেরহাট ও চুয়াডাঙ্গা, নজরুল ইসলাম মঞ্জু নড়াইল, আসাদুল হাবিব দুলু দিনাজপুর ও সৈয়দপুর, সাখাওয়াত হোসেন জীবন সুনামগঞ্জ, বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন পিরোজপুর, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহ, ঝিনাইদহ জেলা সভাপতি মশিউর রহমান কুষ্টিয়া নেতৃত্ব দেবেন। তাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারাও থাকবেন।

এই সব টিম সারাদেশে কর্মীসভা ও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে নির্দেশনা দেবেন বলে জানিয়েছেন রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেন, ‘সারা দেশে প্রতিটি জেলায় কর্মীসভা করবেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। সেখানে জাতীয় রাজনীতি নিয়ে তারা আলোচনা করবেন, সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করবেন।’

এদিকে শুধু বিএনপির তৃণমূল নয়, দলের অন্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকেও মাঠপর্যায়ের কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করতে নির্দেশ দিয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দীর্ঘদিন তৃণমূলে যেসব ইউনিটে কমিটি হচ্ছে না সেগুলো দ্রুত কমিটি গড়ার নির্দেশ দেন তিনি।

যুবদলের কারামুক্ত কয়েকজন নেতা শনিবার রাতে গুলশানের কার্যালয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি তাদের এই নিদের্শনা দেন। সংগঠনের সব স্তরে কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘অনেকেই ব্লেইম করে সারা দেশে তোমাদের কমিটিগুলো করা হচ্ছে না। কমিটি না থাকায় সংগঠনে কাজ করতে পারে না। তাই তোমাদের কমিটিগুলো করতে হবে।

“কমিটি না থাকলে দল শক্তিশালী হবে না। সেজন্য বলব-যুবদল বলি, ছাত্রদল বলি সব অঙ্গ সংগঠনগুলোর কমিটি পূর্ণাঙ্গভাবে করতে হবে”, বলেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.