Thursday , August 11 2022
প্রচ্ছদ / জাতীয় / ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কথায় রাজি হয়নি কামাল: প্রধানমন্ত্রী

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কথায় রাজি হয়নি কামাল: প্রধানমন্ত্রী

ডেস্ক : মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ কামাল ভারতে গেলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী তাকে লেখাপড়া করতে বললেও তিনি রাজি হননি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ কামাল বলেছিলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধ করতে এসেছি; ট্রেনিং নেব বলেও প্রধানমন্ত্রী জানান। শুক্রবার (৫ আগস্ট) শেখ কামালের ৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আয়োজিত শেখ কামাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পুরস্কার ২০২২ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা জানান‌। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কামাল মুক্তিযুদ্ধ যখন যায়, কামালকে কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন লেখাপড়া করার জন্য এবং তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। কামাল কিন্তু তাতে রাজি হয়নি। সে বলেছিল, আমি মুক্তিযুদ্ধ করতে এসেছি, আমি ট্রেনিং নেব। দেরাদুনে ওখান থেকে ট্রেনিং নেয় এবং ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে যায়।

শেখ হাসিনা বলেন, কামাল বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিল। একাধারে সে হকি খেলতো ফুটবল খেলতো ক্রিকেট খেলত, আবার সেতার বাজাতো, ভালো গান গাইতে পারতো, নাটকে অংশগ্রহণ করতো, অনেক নাটক তার করা ছিল। এত প্রতিভা এবং রাজনৈতিক সচেতনতা, যখন কলেজে পড়তো তখন থেকেই ছাত্রলীগের সে একজন সক্রিয় কর্মী ছিল। আমরা সবাই সংগঠন করতাম, আমাদের কখনো কোন পদ নিয়ে চিন্তা ছিল না‌। আমার বাবা যে রাজনীতি করতেন তার আদর্শ নিয়েই আমরা পথ চলতাম। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন যে সাদাসিধে জীবন যাপন করতে হবে। সেটাই আমরা করতাম, সেভাবেই চলতাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির ছেলে বা প্রধানমন্ত্রীর ছেলে, এ নিয়ে কোনো অহমিকা তার ছিল না। কামাল রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল। জাতির পিতা ৭ই মার্চের ভাষণে যে ঘোষণা দিয়েছেন এবং সেই ঘটনাকে সামনে রেখে কামাল প্রত্যেকটা এলাকায় আমাদের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করছিল। কামাল কাজ করত ১৯ নম্বর রোড আবাহনী ক্লাব, সাত মসজিদ রোডসহ ধানমন্ডি এলাকায় যুব সমাজকে নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতো। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকেই ওই রাস্তায় বেরিকেট দেওয়ার জন্য কামাল বাসা থেকে চলে যায় এবং কাজ করতে শুরু করে। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের মানুষের ওপর গণহত্যা শুরু করে সেই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যেটা ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে সারা দেশে ওয়ারলেসের মাধ্যমে প্রচার করা হয় এবং সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। রাতে আমাদের বাসায় আক্রমণ করে আমার বাবাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, আবার আক্রমণ করে। আব্বাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে শুনে কামাল সেই আবাহনী ক্লাবের ওখান থেকে প্রায় প্রায় ৫০টা ওয়াল টপকে মাকে দেখতে আসো। কিন্তু ঐদিন রাতে আবার আমাদের বাড়িতে আক্রমণ করে। কামাল বাঙ্কারে আশ্রয় নেয় এবং সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধে চলে যায়। দেরাদুনে ট্রেনিং নেয় এবং ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে যায়। পরবর্তীতে তাকে কর্নেল ওসমানী যিনি মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রধান সেনাপতি ছিলেন তার এডিসি হিসেবে কামালকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কামাল এবং মেজর নুর একই সাথে ওসমানীর এডিসি ছিল। ১৫ আগস্ট এই নুরই প্রথম আসে, কর্নেল ফারুকের নেতৃত্বে বাড়ি আক্রমণ করে, কর্নেল নুর, হুদা এরা আক্রমণ করে। কামাল গিয়েছিল তাদের দেখতে। ভেবেছিল বোধহয় রিসকিউ করতে এসেছে। ঘাতক হয়ে এসেছে সেটা বোধহয় জানতো না। প্রথম তারা কামালকেই গুলি করে। এরপর একের পর এক সবাইকে হত্যা করে।

শেখ কামালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শুধু ক্রীড়াবিদ না, একজন রাজনৈতিক নেতা হিসাবে তার অনেক দূরদর্শিতা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ছিল, অত্যন্ত মেধাবী ছিল। আমাদের বাসায় সবসময় মানুষ দিয়ে ভরা থাকতো। পরীক্ষার আগে বন্ধুর বাসায় গিয়ে পড়াশোনা করতো যাতে ভালো রেজাল্ট হয়। আমরা পিঠাপিঠি দুই ভাই বোন, একসঙ্গে খেলাধুলা করতাম, ঝগড়া করতাম একই সাথে সাইকেল চালাতাম, একসঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলা পুতুল খেলা বল খেলা সমস্ত… এরকম সম্পর্ক আমাদের ছিল। আমার বাবা অধিকাংশ সময় জেলে থাকতেন, আমার মা আমাদের ভাই-বোনদের গড়ে তুলেছিলেন। আমার বাবার ক্ষমতা ছিল সত্য কিন্তু মা বলতো ক্ষমতার দিকে যেন নজর না দেয়, এভাবেই আমার মা আমাদেরকে গড়ে তুলতেন। কামালও এরকম সাদাসিধে জীবন যাপন করত। সুলতানার সঙ্গে যখন বিয়ের কথা হয়, প্রথমে তার আপত্তি ছিল, বলেছিল সে তো আমার ছোট বোনের মত। কিন্তু জামাল, রেহানা, রাসেল সবাই সুলতানার খুব ভক্ত ছিল। আমি অনেকটা কামালকে জোর করেই রাজি করিয়েছিলাম সুলতানাকে বিয়ে করার জন্য। দুর্ভাগ্য সেও জীবন দিয়ে গেল। আজকে কামাল আমাদের মাঝে নেই। আধুনিক ফুটবল খেলা আবাহনী ক্রীড়া চক্র গড়ে তোলা, বিভিন্ন খেলাধুলায় এ দেশের শিশু কিশোর থেকে শুরু করে যুবকদেরকে সম্পৃক্ত করা, সে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে। পাশাপাশি স্পন্দন শিল্পগোষ্ঠী, সেখানে বিভিন্ন লোকসংগীত আধুনিক সুরের সঙ্গে মিশিয়ে সেগুলোকে জনপ্রিয় করা, এ কাজটা খুব দক্ষতার সঙ্গে করেছে।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মেজবাউদ্দীন প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, ক্রীড়া সংস্থাসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল।